ভ্রমণ

জাপান থেকে ফিরে


  • সানবিন ইসলাম   ঢাকা |
  • প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ০৯:৪৬
  জাপান থেকে ফিরে
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি জাপান যাই। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। ফ্লাইটটি নারিতা বিমানবন্দরে অবতরন করার পর থেকেই সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আমি রীতিমতো মুগ্ধ হতে শুরু করি। এত ভালো কিছু আগে দেখিনি। জাপানি ভাষা না জানা সত্ত্বেও আমার সমস্ত ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। বিমানবন্দরের এই ব্যবস্থাপনাই জাপানের প্রতি আমার উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দেয়। তখন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত জাপান আমাকে নিরাশ করেনি। 

আমার প্রথম চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছিলো প্রতিবেশী একটি ছেলের কাছ থেকে। তার নাম ডিই। ছেলেটির বন্ধুসুলভ আচরণ এবং সহযোগিতার মনোভাব আমাকে আশ্বস্ত করেছিলো। তার কাছেই আমি টোকিও রেস্টুরেন্টের সেবাসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা পেয়েছিলাম। জাপানে টিকে থাকতে যা আমাকে একধাপ এগিয়ে দিয়েছিলো। টোকিওতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা ছিলো এখানকার ছোট নদী এবং খালগুলোর বাঁধানো দুই পাড়। আর তার পাশে বিভিন্ন ধরনের লাগানো গাছ। এসব জায়গায়ই আমি অধিকাংশ সন্ধ্যা উপভোগ করেছি। এখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই কোন পথচারীদের বাড়াবাড়ি। চারিদিকে শুধু নিস্তব্ধ প্রশান্তি। 

আমি জাপানে হানোসিমা, হাকোনেসহ আরো কয়েকটি সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম। এগুলো সুশৃঙ্খল এবং পরিকল্পিতভাবে সাজানো। জলরেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়া জাপানে বেশিরভাগ সমুদ্র সৈকতে যেতে হলে আপনাকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে যেতে হবে। সমুদ্র-সৈকতগুলোতে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে থেকে সাঁতার কাটতে হয়। এখানে সারাক্ষণ ভ্রমন পিপাসুরা দায়িত্বশীলদের তত্বাবধানের আওতায় থাকে। যার ফলে এখানকার সৈকতগুলি হয়ে ওঠে আরো নিরাপদ এবং উপভোগ্য। 

মাউন্ট ফুজি ঘুরে এসে আমি বিমোহিত হয়েছিলাম। একটা পাহাড়কে কেন্দ্র করে হাজারো লোকের সমাগম, এখানকার সাজানো গোছানো রাস্তা, পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য-সব মিলিয়ে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। এই সৌন্দর্য আমাকে আরো দু'বার টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে। 

উন্নত দেশের সব নাগরিক সুবিধা এবং নাগরিকদের প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধের সবটুকুই জাপানে পরিলক্ষিত হয়। নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির জন্য জাপানের 'Tocho' নামে যে সিটি অফিস রয়েছে সেখানে গেলে আপনি অদ্ভূত একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন। এখানে সেবা-প্রদানকারীরা আপনাকে ডেকে ডেকে সেবা দেবে। আপনাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে এবং তারাই আপনাকে প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিকঠাক করে বুঝিয়ে দেবে। এই সিটি অফিস থেকে আর্থিক, ব্যক্তিগত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার সুবিধা পাওয়া যায়। সেবা শেষে তারা আপনাকে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভঙ্গিতে সম্মানপূর্ণ বিদায় জানাবে। তাদের এই দায়িত্ববোধ এবং শিষ্টাচারের মেলবন্ধন আমার জন্য ছিল অবাক করার মত। 

জাপানে মুগ্ধতার অন্যতম বিষয় হলো তাদের মেট্রোরেল পরিবহন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ লোক যাতায়াত করে থাকেন। প্রচন্ড ভীড়ের সময়ও যাত্রীরা চেষ্টা করে একে-অন্যকে সহযোগিতা করতে। তাদের ভিতর কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার চিত্র আমার চোখে পড়েনি। মেট্রোরেলের জানালা দিয়ে আপনি শহরের সৌন্দর্য, অট্টালিকা এবং শত বছরের ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেকটা ধারনা পাবেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, শিল্পায়ন এবং সুচিন্তিত রুচিবোধ একটি দেশকে কিভাবে আধুনিকতম করে গড়ে তুলেছে তার অসংখ্য চিত্র পাওয়া যায় শহরের আনাচে কানাচে। প্রতিটি স্টেশনই যথেষ্ট তথ্যসম্মৃদ্ধ হওয়ায় আমার সকল যাতায়াত নিষ্কণ্টক হয়েছিলো। স্টেশনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়, বিশেষ করে সকাল বেলা অফিস আওয়ারে শুধু হাঁটার এক ধরনের শব্দ শুনতে পেতাম। সবাই যে যার মতো করে সুশৃঙ্খলভাবে যাচ্ছে যা তাদের দৈনন্দিন কাজের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। 

ট্রেনে বই পড়ার সংস্কৃতি এখানে এখনো চোখে পড়ে। যদিও প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে প্রায় সবার হাতেই মোবাইল, ল্যাপটপ না হয় ট্যাব দেখতে পাওয়া যায়। জাপানিদের মধ্যে হেডফোন ব্যবহারের একটা প্রবনতা দেখলাম। ট্রেনে হেডফোন ব্যবহার করার অন্যতম সুবিধা হলো আপনি সময়টাকে আপনার মতো করে ব্যবহার করতে পারবেন। 

জাপানে প্রথমবারের মতো ভেন্ডিং মেশিনগুলো ব্যবহার করতে কিছুটা অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো, কিন্তু পাশ থেকে একজন জাপানির সহযোগিতায় আমি এর ব্যবহার শিখে নিয়েছিলাম। প্রত্যেকটা কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ সমৃদ্ধ হয়। জাপান নতুন নতুন ইতিবাচক আঙ্গিকে আমার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছে। 

জাপানের ট্রাফিক আইন স্বচ্ছ এবং জাপানিরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জাপানে হর্ন বাজানো একধরনের অভদ্রতা অসভ্যতা। ট্রাফিক লাইন হর্ন এসবের মধ্যে যেমন আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ লক্ষ্য করেছি তেমনি সেগুলো যথাযথভাবে পালন করতেও দেখেছি। এখানে আইন ভাঙার প্রবনতা প্রায় নেই বললেই চলে। এখানকার আইন এতো সুনিয়ন্ত্রিত যে, আইন ভাঙলে আইনের আওতায় আসতেই হবে। 

টোকিওর বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। ক্যাম্পাসগুলোতে আধুনিক পরিষেবা চোখে পড়ার মতো। জাপান শিক্ষা ব্যবস্থা যে কতোটা উন্নত তার চিত্র পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।  লাইব্রেরীতে অসংখ্য বই এবং জার্নাল উন্মুক্ত। যার ফলে কোনো বিষয় নিয়ে পড়তে চাইলে সহজেই সে সম্পর্কে অনেকগুলো লেখা পাওয়া যায়। 

আমার প্রফেসর সিনজু মাতসুয়োকার সাথে সামার ক্যাম্প এবং উইন্টার ক্যাম্পে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। পাহাড়ের মধ্যে ক্যাম্প থাকায় যাওয়ার ইচ্ছে আরো বেড়ে যায়। এর মধ্যে বারবিকিউ আয়োজন ছিলো সবচেয়ে ভালো লাগার সময়প্রফেসর নিজে এসে আমাদের সাথে আয়োজন করতে নেমে পড়েছিলেন। এখানকার ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার সম্পর্ক সত্যিকার অর্থেই শিক্ষনীয়। 

সময় জ্ঞান নিয়ে জাপানিজদের সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। এখানে আমি আমার দুই বছরের শিক্ষাজীবনে শুধুমাত্র একদিন প্রফেসরকে দেরি করতে আসতে দেখেছি। প্রফেসর ক্লাস কো-অর্ডিনেটরকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন ট্রেন লাইনে সমস্যা হওয়ার কারণে তাঁর দেরি হচ্ছে। তারপর প্রফেসর এসে বেশ কয়েকবার ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন, যা এখানকার মানুষের শিক্ষা এবং বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ।

জাপানে আমি আশি বছরের বৃদ্ধদেরও দিব্বি কাজ করতে দেখেছি। কাজকে জাপানের নাগরিকরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমার একজন পঁচাশি বছরের বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়, যিনি এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। তার সাথে দেখা হলেই তিনি বলতেন "তোমি কেমন আছো?", এই বাংলাটুকু তিনি শিখেছিলেন। এখানে প্রবীনদের মধ্যেও অসামান্য প্রানশক্তি দেখেছি আমি। সাথে সাথে পেয়েছি অকৃত্রিম আন্তরিকতা। 

জাপানের দিনগুলো আমার দেখতে দেখতে এবং শিখতে শিখতেই কেটেগেছে। এখানে আইনের সঙ্গে দায়িত্বশীলতা আছে, ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধা আছে, আছে অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং শিল্পবোধের বহিঃপ্রকাশ। তাই একজন প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে, একজন ভ্রমণ পিয়াসু হিসেবে সর্বপরি একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে বারবার দেশটিতে যেতে ইচ্ছা হয়।


ক্যাটাগরি: ভ্রমণ

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট

জীবনজয়ী ইতিবাচক বিষয়াদি নিয়ে সাজানো একটি বাংলা ওয়েবসাইট। উচ্ছ্বাস–উল্লাস–উৎসব এই সাইটের প্রাণকথা। সম্প্রীতি–সহমর্মিতা ও দয়াধর্ম-মানবতাকে উচ্চে রাখে জীবনজয়ী।